আপনার সাহায্য, পরামর্শ ও মতামত আমাদের চলার পথকে আনন্দময় করবে। ই-মেইল করুন : info@brindobangladesh.org    
গল্প

Story

পলাশ মাহবুব

উত্তেজনা বনাম সচেতনতা


আমাদের এ অভ্যাস বহু পুরনো। অল্পতেই উত্তেজিত হই। অল্পতেই প্রশমিত। এবং এ দুটি বিষয়ই অতি উচ্চমাত্রার। উত্তেজনা আগুন মাত্রার আর প্রশমন বরফ শীতল। কিছুদিন আগে ছিল সোয়াইন ফু। চারদিকে মাস্ক পড়া লোকের ছড়াছড়ি। দুই টাকার মাস্কের দাম উঠেছিল বিশ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু তা ভুলতে আমাদের খুব বেশি সময় লাগেনি। এখন বিষয়টি একদম আলোচনার বাইরে চলে গেছে। হালের বিষয় হচ্ছে ভূমিকম্প। বেশ কয়েকদিন আগে দেশে মাঝারি আকারের একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। তারপরই বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে আছে। বিশেষজ্ঞদের মুখ থেকে এমন বক্তব্য আসার পর পত্রিকা আর টেলিভিশন টক শোতে একটাই আলোচনা, ‘ভূমিকম্প’। পত্রিকা, টক শো হয়ে সে আলোচনা চায়ের টেবিল ঘুরে ঘরে ঘরে পৌঁছতে খুব বেশি সময় লাগেনি। এখনও সে আলোচনাই চলছে। সবার মধ্যেই ভূমিকম্প আতংক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় মাঝারি মাপের ভূমিকম্প হলে শহরের অধিকাংশ বাড়ি-ঘরই তিগ্রস্থ হবে। সেই ভয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আর বাসায় ঢোকার সময় বিল্ডিংয়ের দিকে তাকান অনেকে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। আপনজন বড় কোনও রোগে আক্রান্ত হলে যেমনটা করি, ঠিক সেরকম। ঢাকা ছেড়ে দূরে কোথাও, যেখানে বড় দালান-কোটা নেই সেখানে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন কেউ কেউ। চাকরি-বাকরি বাদ দিয়ে গ্রামে গিয়ে কৃষিকাজ করার পরিকল্পনাও ঘুরছে অনেকের মাথায়। সবকিছু মিলিয়ে ভূমিকম্প বিষয়টি আমাদের মধ্যে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। আবার উল্টো ধরনের মানুষও আছেন। তারা কোনও কিছুতেই গা করেন না। সব বিষয়ই তাদের কাছে ডাল-ভাত। আমাদের এক বন্ধু প্রথম দলের লোক। ভূমিকম্প ব্যাপারটি তাকে আতংকিত করেছে। তিনি রাজধানীতে থাকেন এবং বাসাও একটি বহুতল ভবনে। চারদিকে যখন ভূমিকম্প নিয়ে এতকিছু তখন তিনিও স্থির থাকতে পারলেন না। তার বাসা যে বিল্ডিংয়ে তার কন্ডিশন জানতে গেলেন বাড়ির মালিকের কাছে। তাদের দু’জনের কথপোকথন একটু শোনা যাক। বন্ধু : চাচা, ভূমিকম্পের বিষয়টা তো জানেন বোধহয়। আমরা তো বিরাট ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছি। তা আপনার এই বিল্ডিংয়ের কি অবস্থা, টিকবে তো? বাড়িওয়ালা : শোনেন চাচা মিয়া, টেকা না টেকা সব তার হাতে। তিনি চাইলে টেকবে। তিনি না চাইলে নাই। তিনি চাইলে কেয়ামত হইয়া গেলেও আমার বাড়ি খাড়াইয়া থাকবে। আর তিনি ইশারা করলে বসন্ত বাতাসের ধাক্কায়ও এই বাড়ি কাইত হইয়া যাইতে পারে। বন্ধু : না, তারপরও, বাড়ির পাইলিং ঠিক-ঠাক হইছে তো? বিল্ডিং কোডঃ বাড়িওয়ালা : সব ঠিক-ঠাক। শোনেন আমার দিল বড়। আমি বেশি ছাড়া কম দেওয়ার মানুষ না। আরেকটা কথা বলি আপনারে, বাঁচা-মরা সব তার হাতে। ধরেন, আপনে যেই বাড়িতে থাকেন সেইটা বিরাট মজবুত বাড়ি। ভূমিকম্পরে কাঁচকলা দেখাইয়া দাঁড়াইয়া থাকবে। কিন্তু দেখা গেলো যখন ভূমিকম্প হইলো তখন আপনে কোনও কাজে পুরান ঢাকা গেছিলেন। কিংবা এমন কোথাও ছিলেন যে বাড়ির কন্ডিশন ভালো না। তো কি লাভ হবে! কোনও লাভ হবে না। আলা মাফ করুক। বুঝলেন চাচা মিয়া, সবই তার হাতে। চিন্তা কইরা কোনও লাভ নাই। আলারে ডাকেন। বন্ধু : নাহ, তারপরও সচেতনতার একটা ব্যাপার তো আছেইঃ বাড়িওয়ালা : এইসব কেতাবের কথা। কেতাবের কথায় যেমন পেট ভরে না। ভূমিকম্প হইলেও কেতাবের কথায় কাজ হইবে না। আমাদের বন্ধুটি বুঝলো বাড়িওয়ালা মারফতি লাইনের লোক। তার সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলে কোনও লাভ নেই। যুক্তি-তর্ক অর্থহীন। শুধু যে এই বাড়িওয়ালার সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই বিষয়টি কিন্তু সেরকম না। পুরো বিষয়টিই একসময় একটি অলাভজনক ব্যাপারে পরিণত হবে। এই যে ভূমিকম্প নিয়ে আমরা এখন এত এত ভাবছি, দুদিন পরেই তা বেমালুম ভুলে যাব। যদি না এর মাঝে আবার কোনও ধরনের ভূমিকম্প হয়। আমাদের অন্য এক পরিচিতের অভিজ্ঞতাও প্রাসঙ্গিক। স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে তিনি বাসা খুঁজতে বের হয়েছেন। থাকেন পুরাতন ঢাকায়। যেটা সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ন এলাকা বলে খবর বেরিয়েছে। তার স্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, হয় এই বাসা ছাড়ো নইলে আমিই তোমাকে ছেড়ে যাবো। পুরান ঢাকার পুরান বাসার চেয়ে পুরাতন হলেও স্ত্রী যে বেশি গুরুত্বপূর্ন এই বোধ আমাদের পরিচিতের আছে। তিনি বের হলে বাসা খুঁজতে। এবং আবিষ্কার করলেন এই শহরের বাড়িওয়ালার বেশি কথা শুনতে অভ্যস্ত না। তারা শুধু বলতে ভালোবাসেন। ব্যাচেলদের ভাড়া দেওয়া হয় না। রাত বারোটার পর গেট বন্ধ। দেয়ালে তিনটার বেশি ফুটো করা যাবে না। এটা করা যাবে না ওটা করা যাবে না। সব শর্ত তাদের দিক থেকেই আসে। ভাড়াটিয়ার দায়িত্ব হচ্ছে চুপচাপ সব মেনে নেওয়া। কিন্তু আমাদের পরিচিত সেই ব্যক্তি উল্টো কাজই করলেন। ভাড়াটিয়াদের জন্য মোটামুটি নরক হিসেবে পরিচিত এই ঢাকা শহরে বাসা খুঁজতে গিয়ে বাড়িওয়ালার কাছে বাড়ি সম্পর্কে এটা সেটা জানতে চাইলেন। পরিচিত : আচ্ছা, আমি যে বাসা ভাড়া নিতে চাচ্ছি সেটার বয়স কত? বাড়িওয়ালা : বাড়ির বয়স দিয়া কি করবেন! আপনি তো বাসা দেখতে আসছেন, মেয়ে দেখতে তো আসেন নাই। এটা কেমন কথা জানতে চাইলেন! পরিচিত : না না। বিষয়টা জানা দরকার। বিল্ডিংয়ের জোর বোঝা দরকার। পাইলিং কি ঠিক মতো করেছিলেন। সিমেন্ট-বালু কি আসল? বাড়িওয়ালা : আপনি কি ভাড়াটিয়া নাকি রাজউকের লোক। ভাই, আমি বাসা ভাড়া দেব না। বাসা ভাড়া হয়ে গেছে। আপনি বসেন। চা খান। কিন্তু আমার বাসা ভাড়া হবে না। এই হচ্ছে অবস্থা। আমাদের মধ্যে দুই দল। একদল উত্তেজিত। অন্যদল নির্লিপ্ত। কিন্তু যে দলটি সবচেয়ে জরুরি সেই সচেতন দলে লোকের খুব অভাব। উত্তেজনা আর সচেতনতা এক জিনিস না। ঠিক তেমনিভাবে নির্লিপ্ততাও কাম্য না। উত্তেজনা নিকের। আর সচেতনতা সব সময়ের। উত্তেজিত আর সচেতন মানুষের মধ্যে ফারাকটাও তাই বিস্তর। আমাদের মধ্যে উত্তেজনা আছে কিন্তু সচেতনতা নেই।




     
Name Comments Date
 
গোলাম সোবহানী পিয়াস খুব ইন্টারেস্টিং...... 2009-12-16
 
rajib khan Nirobota.... 2009-11-13
 
Dilshad Hossain Demand of time.. 2009-11-11
 
Khushi Mustak Bhaloi... 2009-10-24
 
William Rosario Its not a story, but good 2009-10-24

 

Make your comment here