আমরা স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন দেখাতে চাই। আমারা একটি সুসংগঠিত ও মুক্ত মানবসমাজ দ্বারা নির্মিত একটি উর্বর দেশ, উর্বর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি। আমরা সুসংগঠিত হতে পারি তখনি যখন সংস্কৃতি অথবা যাকে আমরা শিক্ষার সারাংশ বলি সেই সারাংশ আমাদের মানসলোকে প্রবেশ করে এর সকল মানসিক দীনতা ও সংকীর্ণতাকে নস্যাৎ করে। সংস্কৃতি শব্দের অর্থ ব্যাপক। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘কমল-হীরের পাথরটাকেই বলে বিদ্যে, আর ওর থেকে যে আলো ঠিকরে পড়ে তাকেই বলে কালচার’ (সংস্কৃতি)। এই ‘আলো ঠিকরে পড়া’ই ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তি সংস্কৃতি ব্যক্তিত্বের উপায়। জ্ঞান অর্জন ও উপলব্ধি ব্যক্তি সংস্কৃতির উপায়। ব্যক্তিত্ব আলোর মতো, ধরাছোঁয়ার বিষয় নয়। আমাদের মানবিক গুণাবলির যোগফলই ব্যক্তিত্ব। আহমদ শরীফ বলেছেন, ‘মানবিক গুণ বলতে আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ, সামাজিক শ্রেয়-চেতনা ও সৌন্দর্যবোধের বিকাশ বুঝি।’ আমরা ব্যক্তি সংস্কৃতিচর্চাকারীরা ব্যক্তিত্বের জাগরণ প্রত্যাশী। আমাদের মনোজগৎ বা মানসলোকে যেকটি ব্যবস্থা বা উপায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে তন্মধ্যে জ্ঞানচর্চাই শ্রেষ্ঠ। কারণ হিসেবে আহমদ শরীফ বলেছেন, ‘শিক্ষা মানুষের রুচি করে পরিস্রুত, বুদ্ধি করে তীক্ষ্ণ, মন করে পরিচ্ছন্ন, মনন করে মার্জিত ও বিন্যস্ত।’ কুসংস্কার, অশিক্ষা, ভোগবাদীতা, সাম্প্রদায়িকতা, প্রতিক্রিয়াশীলতা এগুলো আমাদের মানসলোকের এক একটি কৃষ্ণগহ্বর। প্রকৃত জ্ঞানই পারে আমাদের এই অন্ধকার গুহাগুলোতে আলোকপাত করতে। জ্ঞানই পারে দীর্ঘদিনের লালিত তমসাকে দূর করতে। যে শিক্ষা তা করতে অসফল সে শিক্ষার কোনো মূল্য নেই। সংস্কৃতিচর্চা কঠিনতম কাজের একটি। একই সাথে সবচেয়ে আনন্দময় কাজও। কঠিন কেননা, সংস্কৃতিচর্চার আরেক অর্থ ত্যাগ। ত্যাগ ২ ধরনের, ১. যা কিছু মন্দ ও অকল্যাণকর সেগুলোকে ঘৃণার সাথে ত্যাগ, আর ২. নিজের স্বার্থ অন্যের কল্যাণে ত্যাগ। এই ত্যাগের চেষ্টাই সংস্কৃতিচর্চা। এ প্রসঙ্গে মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, ‘সত্যকে ভালোবাসা, সৌন্দর্যকে ভালোবাসা, ভালোবাসাকে ভালোবাসা, বিনা লাভের আশায় ভালোবাসা, নিজের ক্ষতি স্বীকার করে ভালোবাসা-এরই নাম সংস্কৃতি।’ একেই বলে ব্যক্তি সংস্কৃতি। ঈদ, দুর্গা পূজা, নববর্ষ ইত্যাদি সামাজিক সংস্কৃতি; আত্মশুদ্ধি, ন্যায়ের পক্ষাবলম্বন, সুন্দরের বন্দনা ইত্যাদি ব্যক্তি সংস্কৃতির অন্তর্গত। আমাদের জন্য শাণিত ও দৃঢ় ব্যক্তিত্ব এবং একটি পরম আনন্দের জগৎ সৃজন করাই সংস্কৃতির প্রধান কাজ। ব্যক্তি সংস্কৃতি আমাদের যুক্তি-চিন্তা-ভাবনা, জ্ঞান ও শিাকে সুসংগঠিত করে আমাদেরকে কালচার্ড অর্থাৎ সংস্কৃতবান তথা ব্যক্তিত্ববান করে তোলে। ব্যক্তিত্ববান হওয়া সংস্কৃতিচর্চাকারীর লক্ষ্য। কেননা চর্চাকারী জানেন, প্রকৃত মানবকল্যাণ ও মুক্তসমাজ কেবলমাত্র সংস্কৃতবান মানুষের অবদানেই সম্ভব। মোতাহের হোসেন চৌধুরী আহ্বান জানিয়েছেন, ‘দশের মধ্যে এগারো হও, দশের মধ্যে থেকেই নিজেকে নিজের মতো করে, সর্বাঙ্গসুন্দর করে তোলো। তাতেই হবে তোমার দ্বারা সমাজের শ্রেষ্ঠ সেবা।’
সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে আমাদের যুক্তি-চিন্তা-ভাবনাগুলো যখন ধীরে ধীরে মুক্তি পেতে থাকে তখন আমরা একজন সংস্কৃতবান মানুষের সাথে সাথে একজন সৃজনশীল মানুষ হিসাবেও আত্মপ্রকাশ করি। আমরা তখন শিল্পী হই বা না হই শিল্পমনা ঠিকই হয়ে ওঠি। একজন সৌন্দর্য-পূজারীর শিল্পমনা না হয়ে উপায় থাকে না। আর সেখানেই মহা-আনন্দ। সৃজনশীলতা এক ধরণের খেলা যা মানুষকে পরম আনন্দলোকে নিয়ে যায়। এক একজন সংস্কৃতবান মানুষ দশের মধ্যে এগারো হওয়ার চেষ্টাই আজীবন করে যায় কোনো লাভের আশা ছাড়াই। কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন, ‘না-ই'বা হল কালজয়ী খ্যাতি তোমার, যায় যদি যাক/ মুছে তোমার নামের রেখা কালের পটের ক্ষেত্র থেকে,/ দুঃখ কিসের? ঘটছে অমন হরহামেশা নানা যুগে;/ যে-সাধনে রইলে সেটাই অটুট থাকুক জীবন জুড়ে।’ এই সাধনা নিশ্চই হঠাৎ করে দেশ বা বিশ্বকে পাল্টে দিতে পারবে না। তবে আমরা বিশ্বাস করতে পারি, ব্যক্তি পর্যায়ের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আরো কিছু ক্ষুদ্র প্রয়াসের পথকে সুগম করবে, কিছু ক্ষুদ্র প্রয়াস অনেকগুলো ক্ষুদ্র প্রয়াসের অনুপ্রেরণা হবে। এভাবে একদিন দেশ কেন, পুরো পৃথিবীটাই বদলে যেতে বাধ্য, স্নিগ্ধ আলোয় পৃথিবী কানায় কানায় পূর্ণ হবে । কন্টকমুক্ত হবে আগামী।
সেই লক্ষ্যে পৌছাতে শিক্ষা ও পরিশ্রম পাথেয় করে আমাদেরকে যেতে হবে অনেক অনেক দূর।
